একজন রিক্সাচালকের আত্মকথা : মনের কথা

একজন রিক্সাচালকের আত্মকথা


md shakil ahemed:

আমি একজন রিক্সাচালক। মানুষ আমাকে রিক্সাওয়ালা বলে। চালক বলতে চায় না। তাতে আমার কোন দু:খ নাই। যেহেতু রিক্সা চালাই সেহেতু রিক্সাওয়ালা বলতেই পারে। কিন্তু যখন মানুষ আমাকে এই ‘খালি’ বলে ডাকে তখন আমার মনটা একেবারে খারাপ হয়ে যায়। ‘খালি’ আবার কি? এটা কি কোন নাম হতে পারে? আমাকে কি ‘ভাই’ বলে ডাকা যায় না? আচ্ছা, সম্মানের খাতিরে ‘ভাই’ নাই বললো, কিন্তু অন্তত রিক্সাওয়ালা তো বলা যায়। কিন্তু তা না বলে আমাকে ডাকে ‘খালি’। আমাকে এখন ‘খালি’ বললে আমি আর শুনি না। ভাই, নিজের আত্মসম্মান বোধ কিছুটা হলেও তো আছে। এদেশে তো আর গঙ্গার জলে ভাইসা আসি নাই। কিছুটা সম্মানবোধ তো আছে! হতে পারি রিক্সাওয়ালা! কিন্তু আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
আমি মানুষের কাছে বেশী ভাড়া চাই না। ন্যায্য ভাড়া চাই। ন্যায্য ভাড়া নেই। বেশী দিতে চাইলেও নেই না। সবচেয়ে খারাপ লাগে মানুষ যখন আমার সাথে ১০ টাকার জন্য দরা-দরি করে। এতো কষ্ট করি, কিন্তু শুধু ১০ টাকার জন্য মানুষের সাথে যখন সমস্যা হয়, তখন অন্তরটা জ্বলে যায়। সবার সাথে যে সমস্যা হয় তাও না। গুটি কয়েক ব্যক্তির সাথে সমস্যা হয়। বেশীরভাগ মানুষই কিন্তু ভালো। আমার সাথে আরেকটা সমস্যা হয়। কিছু মানুষ আছে, ভাড়া না বলে আমাকে নিয়ে যায়। কিন্তু গন্তব্যে গিয়ে আমাকে ভাড়া কম দেয়। তখন আর কিছু বলার থাকে না। নিজেরে নিজে মারতে ইচ্ছা করে, কেন ভাড়া ফয়সালা না করে উনাকে রিক্সায় উঠালাম?
আমার বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও- এ। আমার বাড়ী গফরগাঁও রেল স্টেশনের পাশেই। আমি ট্রেনে খুব সকাল বেলা ঢাকায় আসি এবং ২/৩ দিন একনাগারে রিক্সা চালিয়ে আবার রাতে ট্রেনে বাড়ীতে চলে যাই। বাড়ীতে কয়েকদিন থেকে আবার ঢাকায় আসি। ঢাকায় এসে রিক্সা গ্যারেজে থাকি। আমি ফার্মগেট এলাকায় বেশী রিক্সা চালাই। তবে অন্য জায়গায় যে যাই না তাও নয়। এজন্য ফার্মগেটের অলি-গলি সব আমার চিনা-পরিচিত। আমি রিক্স চালিয়ে যা পাই তা দিয়ে মোটামুটি চলে যায় ভালই। তবে এই লকডাউনে আমার অনেক ক্ষতি হয়েছে। ট্রেন না চলার জন্য আমি ঢাকা আসতে পারি নি। আমার স্ত্রী বাড়ীতে কাজ করে। আমি যেহেতু ঢাকায় চলে আসি, তাই আমার স্ত্রী আমার সংসার দেখভাল করে। আমার বড় ছেলে গত বছর ইন্টারমিডিয়েটে অটো পাশ দিয়েছে। সে স্থানীয় কলেজে পড়েছে। তার রেজাল্ট খুব ভালো হয়েছে। আমার মেয়েটা ছোট। এখনও স্কুলে দেই নি।
আমি ঢাকা শহরে একজন ভালো মানুষের সন্ধান পেয়েছি। তিনি প্রতিদিন অফিস থেকে রাত ১০ টার দিকে বের হয়। কিন্তু কাকতালিয়ভাবে আমিও রাত ১০ টার দিকে তার অফিসের সামনে থাকি। তিনি আমাকে প্রায় প্রতিদিন তার বাসায় নিয়ে যায়। তিনি কখনো ভাড়া কম/বেশী দেন না। বাজারে যা ভাড়া আছে তাই দেন। এমন ভালো লোক আমি কম দেখেছি। একেবারে জীবন্ত ফেরেশতা! তাকে দাওয়াত করে খাওয়ানোর ইচ্ছা হয়। কিন্তু ভয়ে দাওয়াত করতে পারি নি, না জানি উনি কি মনে করে!
তো, শেষে একটি ভালো খবর দিয়ে শেষ করি। এবার মেডিক্যাল ভর্তি পরীক্ষায় আমার ছেলে ঢাকা মেডিক্যালে চান্স পেয়েছে। এটা আমার জন্য অনেক বড় খবর। আমার ছেলের জন্য আমার জীবন স্বার্থক হয়েছে। আমি দোয়া করি, আমার ছেলে যেনো ডাক্তার হয়ে মানুষের সেবা করতে পারে। সাথে সাথে আরেকটি ভয়ও কাজ করছে। ছেলে ঢাকা থাকলে আমি ঢাকায় রিক্সা চালাতে পারবো তো? ছেলের আত্মসম্মানে বাঁধবে না? এরকম বিষয় হলে আমি ছেলেকে বোঝাবো যে, দুনিয়ায় কোন কাজই ছোট না।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ